আইএসএসবির জন্য কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া কি উচিত? ১৩টি কারণ
[ সংক্ষেপে ]
আইএসএসবি আসলে দেখে একজন ক্যান্ডিডেট মানুষ হিসেবে কেমন। তার পার্সোনালিটি, স্বাভাবিক রিঅ্যাকশন, সততা আর লিডারশিপের পটেনশিয়াল। বাংলাদেশ আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্সের অফিসার সিলেকশন এই জিনিসের ওপরই দাঁড়িয়ে। আর ঠিক এই কারণেই সাধারণ কোচিং সেন্টারের পদ্ধতিটা এখানে খাটে না। কেন খাটে না, তা নিচে দেওয়া হলো।
১. আইএসএসবি দেখতে চায় ক্যান্ডিডেট আসলে কেমন, কোচিং সেখানেই উল্টো কাজ করে
বোর্ড ক্যান্ডিডেটের স্বাভাবিক আচরণটাই দেখতে চায়। কোচিং করলে সেই স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে যায়। কোচিং করা অনেক ক্যান্ডিডেট কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়ে, ভাবে পাস করার একটাই “ঠিক” রাস্তা আছে। ফলে নিজের আসল রূপ না দেখিয়ে সাজানো একটা ভার্সন দেখায়।
২. অনেক ইনস্ট্রাক্টরেরই পড়ানোর মতো যোগ্যতা নেই
অনেক কোচ নিজেও আগে ক্যান্ডিডেট ছিল, কেউ গ্রিন কার্ড পেয়েছে, কেউ রেড কার্ড। কিন্তু একটা প্রসেসের ভেতর দিয়ে গেলেই সেটা বোঝা হয়ে যায় না। এমন কোচিং সেন্টারও আছে যেগুলোর ওনার আর হেড ট্রেইনার, দুজনেরই সিলেকশন প্রসেসের কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। তবু তারা শত শত ক্যান্ডিডেটকে কোচিং করাচ্ছে, এমন স্বপ্ন বিক্রি করছে যা পূরণ করার সাধ্য তাদের নেই, আর মাঝেমধ্যে ভালো ক্যান্ডিডেটদেরও ভুল পথে নিয়ে গিয়ে বাদ পড়িয়ে দিচ্ছে। বেশিরভাগ ট্রেইনার জানে আইএসএসবিতে কী কী টেস্ট হয়, কিন্তু নিজে কী কারণে গ্রিন বা রেড কার্ড পেয়েছে সেটা জানে না। রিকমেন্ডেশন কীভাবে ঠিক হয় তা ব্যাখ্যা করতে পারে না, তাই কীভাবে ইমপ্রুভ করতে হবে সেই সঠিক গাইডলাইনও দিতে পারে না।
৩. আলাদা করে ক্যান্ডিডেটের ফিডব্যাক দেওয়া হয় না
এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। বেশিরভাগ সেন্টারে সবাইকে একসাথে বসিয়ে একই কথা বলা হয়। একজন ক্যান্ডিডেটের নিজের দুর্বলতা কী, বারবার কোন ভুলটা করছে, এটা খুব কম ক্যান্ডিডেটকেই বলা হয়। ফিডব্যাক ছাড়া নিজেকে ঠিক করা যায় না, শুধু একই ভুল আরও কনফিডেন্স নিয়ে প্র্যাকটিস করা হয়। আরও খারাপ ব্যাপার হলো, ফিডব্যাক দিলেও সেটা ভুল হতে পারে। ট্রেইনার এমন কিছুকে “ভুল” ভাবতে পারে যা আসলে ভুলই না, আর সেটা ঠিক করতে গিয়ে ক্যান্ডিডেটের আসল পার্সোনালিটিটাই বদলে দিতে চায়। আইএসএসবির অ্যাসেসররা এই কোচিং করা ক্যান্ডিডেটদের সহজেই ধরে ফেলে। এরা বাদ পড়ে দুর্বল বলে না, বরং নিজের আসল সত্তা লুকিয়ে রেখেছিল বলে, আর আইএসএসবি এদের আসল রূপটা যাচাই করতেই পারেনি।
৪. কোচিংয়ের মক টেস্ট আসল আইএসএসবির ধারেকাছেও না
কোচিং সেন্টারের মক টেস্ট সাধারণত এমনভাবে বানানো হয় না যেভাবে আইএসএসবির সাইকোলজিস্ট, জিটিও আর ইন্টারভিউ অফিসাররা আসলে এভালুয়েট করেন। মকে ভালো রেজাল্ট এলে ভুয়া কনফিডেন্স তৈরি হয়, আবার খারাপ রেজাল্ট এলে একজন ভালো ক্যান্ডিডেটও অকারণে ভেঙে পড়তে পারে। তাছাড়া আইএসএসবিতে “একটাই ঠিক উত্তর” বলে কিছু নেই। একই উত্তর একজনের জন্য কাজ করে, আরেকজনের জন্য করে না, কারণ মূল্যায়নটা হয় প্রত্যেকের নিজের পার্সোনালিটি অনুযায়ী। তাই মক টেস্টের কোনো মানে হতে হলে ক্যান্ডিডেটের পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে হয়, আর সাধারণ কোচিং সেন্টারে সেটা প্রায়ই থাকে না।
৫. ভুল গাইডলাইন ভালো ক্যান্ডিডেটকে রেড কার্ড পাইয়ে দেয়
অনেক ক্যান্ডিডেটেরই গ্রিন কার্ড পাওয়ার মতো যোগ্যতা ছিল, কিন্তু কোচিংয়ের কথা শুনে তারা অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেছে। কথা বলার ধরন, গ্রুপ টাস্কে আচরণ, নিজের সম্পর্কে লেখা, ইন্টারভিউয়ের উত্তর, সবকিছু একটা ফর্মুলা মেনে বদলে ফেলেছে। বোর্ডে গিয়ে সেই আচরণ জোর করে করা মনে হয়, আর ফল হয় রেড কার্ড, যেটা স্বাভাবিক থাকলে হয়তো পেতই না। এটা প্রায় প্রতিটা বোর্ডেই শোনা যায়: ভালো ক্যান্ডিডেট ভুল পরামর্শ ফলো করতে গিয়ে ফেল করে।
৬. মুখস্থ বা শেখানো আচরণ অ্যাসেসররা সহজেই ধরে ফেলে
আইএসএসবির অ্যাসেসররা হাজার হাজার ক্যান্ডিডেট দেখেছেন। মুখস্থ উত্তর, কপি করা গল্প, কোচিংয়ে শেখানো বিহেভিয়ার, সাজানো লিডারশিপ, এসব খুব তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে। সাইকোলজিক্যাল টেস্টগুলো কয়েকদিন ধরে ক্যান্ডিডেটের কনসিস্টেন্সি দেখে, আর এতদিন ধরে নকল অভিনয় চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন।
৭. কোচিং “পারফেক্ট ক্যান্ডিডেট”-এর মুখোশ পরায়
অনেক সেন্টার ক্যান্ডিডেটদের শেখায় নিজেকে একদম নিখুঁত দেখাতে, সবসময় পজিটিভ থাকতে, কখনো কোনো সমালোচনা না করতে। কিন্তু সিলেক্টররা চায় সৎ, ব্যালান্সড আর স্বাভাবিক মানুষ। বেশি পজিটিভ হতে গেলে ক্যান্ডিডেটকে ডিফেন্সিভ আর অগভীর মনে হয়।
৮. সবাইকে একই স্ক্রিপ্ট শেখানো হয়
বড় ব্যাচকে একই টেমপ্লেটে ট্রেইনিং দিলে সবাই একরকম হয়ে যায়, কারও আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে না। অথচ আইএসএসবি চায় ক্যান্ডিডেটের নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড, নিজের অভিজ্ঞতা আর নিজের চরিত্র। আগের কোনো টপারের কপি না।
৯. কোচিং ইন্ডাস্ট্রির ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই
এখানে কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই, সার্টিফিকেশন নেই, কেউ জবাবদিহিও করে না। কেউ নিজেই নিজেকে এক্সপার্ট বলে দাবি করে, কেউ শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার পরিচিতির ওপর চলে, আর সাফল্যের দাবি যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। যে ক্যান্ডিডেটদের ভেতরে স্বাভাবিক সম্ভাবনা আছে, তারা ফিজিক্যাল কোচিং সেন্টারে যাক বা না যাক, রিকমেন্ড হওয়ার চান্স তাদের বেশি।
১০. টাকাপয়সা আর প্রতারণার ঝুঁকি
ফি অনেক সময়ই অনেক বেশি হয়, আর সামরিক নিয়োগের জায়গাটা প্রতারকদের জন্য সুযোগের জায়গা। আইএসপিআর বারবার সতর্ক করেছে যে সেনাবাহিনীর ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা হচ্ছে। যারা টেনশনে থাকে, সেই ক্যান্ডিডেট আর তাদের পরিবার “চেনাজানা আছে” বা “রিকমেন্ডেশন গ্যারান্টি” টাইপ মিথ্যা প্রতিশ্রুতির সহজ টার্গেট।
১১. প্রস্তুতির জন্য কোচিং সেন্টার লাগেই না
আইএসএসবির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ভিডিওর মাধ্যমে প্রতিটা টেস্ট বিস্তারিত বোঝানো আছে, তাই যে কেউ ফ্রিতে সরাসরি সোর্স থেকে দেখে নিতে পারে প্রতিটা ধাপ কীভাবে কাজ করে। বই, অনলাইন রিসোর্স আর বাসায় বা জিমে ফিটনেস প্র্যাকটিসও সবার জন্য খোলা। নিজেকে সৎভাবে বোঝার জন্য কোনো টাকা লাগে না। প্রতি বছর সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ডের ক্যান্ডিডেটরাও রিকমেন্ড হয়, আর বোর্ড কোনো নির্দিষ্ট ধরনের স্কুল বা প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা দেয় না।
১২. টাকা, সময় আর অন্যের ওপর নির্ভরতা
কোচিংয়ে টাকা যায়, যাতায়াতে সময় যায়। এই টাকা আর সময় ফিটনেস, জেনারেল নলেজ আর নিজেকে চেনার পেছনে খরচ করা যেত। তাছাড়া ইনস্ট্রাক্টরের ওপর নির্ভর করার অভ্যাসও তৈরি হয়, অথচ আইএসএসবি দেখে ক্যান্ডিডেট কতটা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে আর নিজে থেকে উদ্যোগ নিতে পারে।
১৩. কোচিং সেন্টারে পিএটি আর গ্রাউন্ড টাস্ক প্র্যাকটিস
অনেকেই শুধু পিএটি (ফিজিক্যাল অ্যাবিলিটি টেস্ট) আর গ্রাউন্ড টাস্ক প্র্যাকটিসের জন্য কোচিংয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু নিয়মিত ব্যায়াম করলে আর আপার বডির স্ট্রেংথ বাড়ালে আইএসএসবির বেশিরভাগ ফিজিক্যাল টেস্টই সহজে করা যায়। অনেকে চিন-আপ দিতে পারে না, আর কোনো কোচিং সেন্টার ক্যান্ডিডেটের হয়ে সেটা ঠিক করে দিতে পারে না। এই ব্যায়ামগুলো বাসায় বা জিমেই করা যায়।
গ্রাউন্ড টাস্কগুলো এত সহজ যে জিটিও যখন বুঝিয়ে দেন, তখন মন দিয়ে শুনলে প্রায় যে কেউ করতে পারে। আর সেটাই সবচেয়ে ভালো উপায়। কোচিং সেন্টারে বারবার প্র্যাকটিস করলে “ওই সেন্টারের নিজস্ব স্টাইলে” করার অভ্যাস হয়ে যায়। বোর্ডে গিয়ে ছোটখাটো নির্দেশনা মিস হয়ে যায়, আর অজান্তেই অভ্যাসমতো করে ফেললে শেষে বাদ পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাহলে কী করা উচিত
- আগে থেকেই ধীরে ধীরে ফিটনেস বানানো উচিত, বাসায় বা জিমে।
- পরীক্ষার স্ট্রাকচারটা জেনে নিয়ে তারপর নিজেকে বোঝার দিকে মন দেওয়া ভালো।
- যারা ক্যান্ডিডেটকে ভালো চেনে, তাদের কাছ থেকে তার ভালো আর খারাপ দিকগুলো সৎভাবে জেনে নেওয়া দরকার।
- রিকমেন্ড হওয়া ক্যান্ডিডেটদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা যায়, কিন্তু তাদের উত্তর হুবহু কপি করা ঠিক না। অনেকে অন্যের কাজে লাগা জিনিস নকল করে, কিন্তু সেটা তার নিজের সাথে মেলে না। তখন যত ভালোই পারফর্ম করুক, বাদ পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
- প্রতিটা ধাপে স্বাভাবিক, সৎ আর কনসিস্টেন্ট থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি।